রুদ্র মোহাম্মদ ইদ্রিস॥
মানুষ সামাজিক জীব। সভ্যতা বিকাশের সঙ্গে সঙ্গে মানুষ শিখেছে সহনশীলতা, শিখেছে ভালোবাসা, মমতা ও ক্ষমার মর্ম। কিন্তু দুঃখজনকভাবে, আজ সেই মানবিক গুণগুলো ক্রমেই বিলুপ্তির পথে। পারিবারিক, সামাজিক এমনকি রাষ্ট্রীয় পর্যায়েও হিংসা ও প্রতিহিংসার এক নির্মম প্রতিযোগিতা চলছে, যার পরিণতিতে ধ্বংস হচ্ছে পরিবার, সমাজ ও মানবতা।
সম্প্রতি ব্রাহ্মণবাড়িয়ার নাসিরনগরে একজন বৃদ্ধ পিতা তার সন্তানের হাতে যেভাবে রক্তাক্ত হয়েছেন, তা কেবল একটি পারিবারিক সহিংসতার ঘটনা নয়-এটি আমাদের সমাজব্যবস্থার ভয়াবহ অবক্ষয়ের প্রতীক। সন্তানের হাতে পিতার হাত-পা ভেঙে যাওয়া, রগ কেটে ফেলা-এসব কিছুই শুধু শারীরিক আঘাত নয়, এগুলো আমাদের মূল্যবোধে চরম আঘাত।
এই ঘটনার নেপথ্যে রয়েছে লোভ, ক্ষমতার দম্ভ, সহিষ্ণুতা ও সহমর্মিতার অভাব। অথচ আমরা যদি একবার ভাবি-এই হিংসা কি সমস্যার সমাধান করেছে? না। বরং পরিস্থিতি করেছে আরও জটিল, বাড়িয়েছে মানসিক ও সামাজিক দূরত্ব। হিংসার জবাবে প্রতিহিংসা নিলে ক্ষতি হয় উভয়পক্ষের।
প্রতিহিংসা এক ধরনের মানসিক অন্ধকার, যা মানুষকে বিবেকশূন্য করে তোলে। পরিবারে যদি ক্ষমা ও বোঝাপোকার জায়গা না থাকে, সেখানে সম্পর্ক ভেঙে যায়, ছিন্ন হয় রক্তের বন্ধন। সমাজে যদি আইন ও ন্যায়বিচারের ওপর আস্থা না থাকে, তাহলে মানুষ নিজের হাতে বিচার করতে যায়-ফলে জন্ম নেয় প্রতিহিংসা, জন্ম নেয় অশান্তি।
একটি শান্তিপূর্ণ সমাজ গঠনের জন্য দরকার সহনশীলতা, সংযম ও সংলাপ। সমস্যার সমাধান হয় কথোপকথনের মাধ্যমে, আইনের মাধ্যমে- ছুরি বা রক্ত দিয়ে। একজন ভুল করলে তার জবাব আরেকজনের ভুল দিয়ে দেওয়া যায় না। এর ফলে কেবল আগুন বাড়ে, আশ্রয় হারায় শান্তি।
আমাদের ব্যক্তিজীবন থেকে শুরু করে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় স্তর পর্যন্ত হিংসার পথ পরিহার করতে হবে। আমাদের মনে রাখতে হবে, “হিংসা-প্রতিহিংসা কোনো সমাধান নয়, বরং তা আগুনে ঘি ঢালা হয়।” শান্তিই শেষ পর্যন্ত টেকে, এবং শান্তির মাধ্যমেই টিকে থাকে মানুষ ও মানবতা।
