ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর থেকে বিশেষ প্রতিনিধি॥ “ঘোষিত আদর্শ গ্রাম”-এই পরিচয়ে আমরা জানি ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলার মাছিহাতা ইউনিয়নের চান্দপুর গ্রামের নাম। কিন্তু বাস্তবতায় এই গ্রাম যেন এক নির্মম পরিহাস। রাষ্ট্রের পরিকল্পনা, জনপ্রতিনিধিদের প্রতিশ্রুতি আর জনসচেতনতার ঘাটতি মিলে এক ভয়াবহ চিত্র তৈরি হয়েছে এখানে। নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সামাজিক আন্দোলন ‘তরী বাংলাদেশ’-এর একটি দল ১৯ সেপ্টেম্বর সকাল ১০টা থেকে দুপুর ১২টা পর্যন্ত পায়ে হেঁটে পুরো গ্রাম ঘুরে যা দেখেছে, তা রীতিমতো বিবর্ণ করে দেয় যে কোনো আদর্শ গ্রামের স্বপ্নকেই।
প্রায়, দুই ঘণ্টার এই পদযাত্রায় তরী বাংলাদেশ-এর সদস্যরা স্থানীয় মানুষদের সঙ্গে কথা বলেন, বিভিন্ন জায়গা পরিদর্শন করেন এবং তুলে ধরেন বাস্তবতার নির্মম চিত্র। গ্রামের প্রায় সব সরকারি খালই আজ বেদখল হয়ে গেছে। কোথাও অবৈধ দখল, কোথাও আবার খালের অস্তিত্বই নেই। যে খালগুলো দিয়ে একসময় পানি চলাচল করত, আজ সেগুলো যেন স্মৃতির পাতায় ঠাঁই নেওয়া নামমাত্র জলপথ।
এমনকি ঘর, রাস্তা, জমি-সবই ডুবে আছে জলাবদ্ধতায়।
চান্দপুর গ্রামে ঢুকলেই চোখে পড়ে পানির রাজত্ব। বাড়িঘর, চলাচলের রাস্তা, এমনকি ফসলী জমিও জলাবদ্ধতায় আক্রান্ত। অনেক জায়গায় হাঁটুর ওপর পানি জমে আছে, যার কারণে শিশু থেকে শুরু করে বৃদ্ধ সবাইকেই সীমাহীন দুর্ভোগের মধ্যে দিন কাটাতে হচ্ছে। বর্ষাকালে এই পরিস্থিতি আরও ভয়াবহ রূপ ধারণ করে বলে জানান স্থানীয়রা।
আদর্শ নয়, অবহেলার প্রতিচ্ছবি।
যে ইউনিয়নটিকে মডেল বা আদর্শ ইউনিয়ন হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছিল, সেই ইউনিয়নের একটি গ্রামের এমন করুণ অবস্থা প্রশ্ন তোলে পুরো ব্যবস্থাপনাকেই। স্থানীয়রা জানান, বিভিন্ন সময় সরকারি কর্মকর্তারা আসেন, রাজনৈতিক নেতারাও ঘুরে যান; দেন কিছু আশ্বাস, তোলেন কিছু ছবি-কিন্তু সেগুলোর আর কোনো ফলোআপ থাকে না। উন্নয়নের ঘোষণা থাকে খবরে, কিন্তু বাস্তবতার মাটিতে দেখা যায় কেবল জলাবদ্ধতা, অব্যবস্থাপনা আর দুর্ভোগ।
তরী বাংলাদেশের আহ্বান: পরিদর্শন শেষে তরী বাংলাদেশ এর আহবায়ক শামীম আহমেদ ও খালেদা মুন্নীর পক্ষ থেকে ব্রাহ্মণবাড়িয়া সদর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা এবং ব্রাহ্মণবাড়িয়ার জেলা প্রশাসক এর প্রতি জরুরি হস্তক্ষেপের আহ্বান জানানো হয়। সংগঠনটির পক্ষ থেকে জানানো হয়, “এটি কেবল একটি গ্রাম নয়, এটি একটি প্রতীক। রাষ্ট্রীয় উদাসীনতা, স্থানীয় অব্যবস্থাপনা ও জনসচেতনতার অভাব মিলে কীভাবে একটি সমাজ ধ্বংসের মুখে পড়ে, চান্দপুর গ্রাম তার জ্বলন্ত উদাহরণ। এখনই যদি প্রশাসন ব্যবস্থা না নেয়, তাহলে এই অবস্থা ভবিষ্যতে আরও বিস্তৃত আকার ধারণ করবে।”
স্থানীয়দের প্রাণের দাবি: চান্দপুর গ্রামের মানুষজন চান, তারা যেনো অন্তত স্বাভাবিকভাবে চলাচল করতে পারেন। তাদের ঘরবাড়ি যেনো পানির নিচে না ডুবে থাকে, ফসলি জমিগুলো যেন আবারও চাষযোগ্য হয়। তারা চান-সরকার ও জনপ্রতিনিধিরা যেন শুধু আশ্বাস দিয়ে চলে না যান, বরং কার্যকর পদক্ষেপ গ্রহণ করে সমস্যার স্থায়ী সমাধান করেন। উল্লেখ্য: নদী ও প্রকৃতি সুরক্ষা সামাজিক আন্দোলন ‘তরী বাংলাদেশ’ ইতোমধ্যে দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে নদী দখল, জলবায়ু পরিবর্তন এবং পরিবেশগত অব্যবস্থাপনার বিরুদ্ধে সোচ্চার ভূমিকা রেখে চলেছে।
