ড. মাতিন আহমেদ॥
এই পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান ও মর্যাদাপূর্ণ সৃষ্টির নাম “মানুষ”। জাতি, ধর্ম, বর্ণ, শ্রেণি কিংবা পেশা-এইসব পার্থক্য আমাদের পরিচয়ের বাহ্যিক দিকমাত্র; কিন্তু অন্তরে, হৃদয়ে, আবেগ-অনুভূতিতে আমরা সবাই এক। তবুও আজকাল আমরা বারবার দেখছি, মানুষে মানুষে অমানবিকতা, নিষ্ঠুরতা, হিংস্রতা বাড়ছে। সবচেয়ে ভয়াবহ রূপ নিচ্ছে বিচারবহির্ভূত শাস্তি-যা আজ “মব জাস্টিস” নামে পরিচিত, যাকে বাংলায় গণপিঠুনি বলা হয়। এমন এক বাস্তবতায় দাঁড়িয়ে আমাদের উপলব্ধি করা জরুরি যে, মানুষের প্রতি সদয় হওয়া আমাদের নৈতিক, সামাজিক ও ধর্মীয় দায়িত্ব।
মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখা শিখতে হবে:
কোনো মানুষ অপরাধ করলেই সে তার মানবিক মর্যাদা হারায় না। আইন আছে, আদালত আছে-সেই ব্যবস্থার মাধ্যমেই বিচার হওয়া উচিত। কেউ চোর হলে, কেউ সন্দেহভাজন হলে, কেউ সমাজের নিচু স্তরের শ্রমজীবী হলে-তাকে পেটানো, গালাগাল দেওয়া, অপমান করা, এমনকি হত্যা করে ফেলা-এ কেমন সভ্যতা? মানুষকে তার পরিচয় দিয়ে নয়, তার মনুষ্যত্ব দিয়ে দেখার সময় এসেছে।
আমরা ভুলে যাই, প্রতিটি মানুষই কারো সন্তান, কারো ভাই, কারো বাবা, কারো স্বামী। কোনো মানুষকে যখন রাস্তায় গণপিটুনি দেওয়া হয়, তখন তার পরিবারও ধ্বংস হয়ে যায়। পরিবারের দিকে তাকাতে বলুন, দেখুন সেই চিৎকারের অর্থ কতটা গভীর, কতটা যন্ত্রণাদায়ক।
প্রতিটি মানুষই এক স্রষ্টার সৃষ্টি।
ইসলামে বলা হয়েছে, “যে একজন মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করল, সে যেন সমগ্র মানবজাতিকে হত্যা করল” (সূরা মায়েদা: ৩২)। আবার, যে একজন মানুষকে বাঁচাল, সে যেন পুরো মানবজাতিকে রক্ষা করল। ইসলাম কেবল মুসলিমদের নয়, সমস্ত মানবজাতির প্রতি সম্মান প্রদর্শনের নির্দেশ দিয়েছে।
খ্রিস্ট ধর্ম বলে, “তোমার প্রতিবেশীকে তোমার নিজের মতো ভালোবাসো” (Matthew 22:39)।
হিন্দু ধর্মে আছে, “অহিংসা পরম ধর্ম” অর্থাৎ সর্বোচ্চ ধর্ম হলো কাউকে কষ্ট না দেওয়া।
বৌদ্ধ ধর্ম শিক্ষা দেয় করুণা, সহানুভূতি এবং সহনশীলতার পথে হাঁটতে।
সকল ধর্মেই বারবার উচ্চারিত হয়েছে এই সত্য-মানুষের প্রতি সদয় হও, কারণ সে স্রষ্টার সৃষ্টি।
মব জাস্টিস: এক অমানবিক অভিশাপ
সাম্প্রতিক সময়ে দেশে-বিদেশে অনেক মর্মান্তিক ঘটনা ঘটেছে, যেখানে কোনো সন্দেহের ভিত্তিতে সাধারণ মানুষকে পিটিয়ে হত্যা করা হয়েছে। এসব ঘটনায় দেখা গেছে, পরবর্তীতে অনেকেই নির্দোষ প্রমাণিত হয়েছেন। কিন্তু ততক্ষণে তারা জীবন হারিয়েছেন। এই অন্যায় মৃত্যুর দায় কাদের? যাঁরা হাত তুলেছেন, গালি দিয়েছেন, ভিডিও করেছেন, বা চুপ করে থেকেছেন-সবার?
গণপিটুনি কখনোই ন্যায়বিচারের বিকল্প হতে পারে না। বরং এটা আইনবিরোধী, নৈতিকতাবিরোধী, মানবতাবিরোধী। এমন সমাজ যদি গড়ে ওঠে যেখানে মানুষ একে অপরকে শত্রু মনে করে, সন্দেহ করে, ঘৃণা করে-সেখানে সভ্যতা টেকে না, টেকে না ভালোবাসা কিংবা শান্তি।
মানুষকে ভালোবাসা কীভাবে সম্ভব?
মানুষের প্রতি সদয় হওয়া মানে কেবল সাহায্য করা নয়; এর অর্থ হলো সম্মান দেওয়া, সহানুভূতি দেখানো, বোঝার চেষ্টা করা।
কোনো দরিদ্রকে অবজ্ঞা করবেন না-আপনি তার পরিস্থিতিতে পড়লেও এমনই হতে পারতেন।
কোনো অপরাধে অভিযুক্তকে আগে শুনুন-তার কথা জানুন, কারণ বিচার শুধুই আদালতের কাজ।
কেউ বিপদে পড়লে সাহায্য করুন, কারণ একদিন আপনিও সেই জায়গায় পড়তে পারেন।
নিজের সন্তানকে, পরিবারের সদস্যদের শিক্ষা দিন-মানুষকে মানুষ হিসেবে দেখতে শিখুক তারা।
এই সমাজ আমাদের সকলের। আমরা যদি একে সহানুভূতিশীল, মানবিক ও নিরাপদ করে তুলতে চাই, তাহলে অবশ্যই আমাদের মনের ভেতরকার হিংস্রতা, রাগ, প্রতিশোধপরায়ণতা পরিহার করতে হবে। আমাদের হাতে যদি সুযোগ থাকে কাউকে আঘাত করার, তাহলে আমাদের মন হোক সেই হাতকে থামানোর শক্তি।
স্মরণে রাখুন, মানুষের প্রতি সদয় হওয়া দুর্বলতা নয়, এটি সবচেয়ে বড় শক্তি। এই শক্তি দিয়েই আমরা বদলে দিতে পারি সমাজকে, দেশকে, এমনকি পুরো পৃথিবীকেও। মানুষের প্রতি সদয় হওয়া আমাদের দায়িত্ব নয় কেবল-এটি আমাদের অস্তিত্ব রক্ষার শর্ত।
