অনলাইন ডেস্ক
গত শনিবার থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালাচ্ছে। এরই মধ্যে ইরানে ১৭৬ শিশুসহ প্রায় এক হাজার ১০০ বেসামরিক মানুষ নিহত হয়েছে।
ইরানও তাৎক্ষণিক পাল্টা হামলা চালাতে শুরু করে। দেশটি ইসরায়েলে ক্ষেপণাস্ত্র ও ড্রোন হামলার পাশাপাশি মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন দেশে যুক্তরাষ্ট্রের স্বার্থ সংশ্লিষ্ট স্থাপনায় হামলা চালাচ্ছে। ফলে এটি ইতোমধ্যে একটি আঞ্চলিক যুদ্ধে রূপ নিয়েছে।
যেহেতু ইরান তাদের উপসাগরীয় প্রতিবেশী ও যুক্তরাষ্ট্রের মিত্র আরব দেশগুলোতে মার্কিন স্বার্থ সংশ্লিষ্ট বিভিন্ন স্থাপনায় ব্যাপকভাবে হামলা অব্যাহত রেখেছে। তাই যুদ্ধ পরিস্থিতি ক্রমশ অবনতির দিকে যাচ্ছে।
এ নিয়ে একটি বিশ্লেষণধর্মী প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে ব্রিটিশ সংবাদমাধ্যম বিবিসি। এতে বলা হয়েছে, এই যুদ্ধ কখন, কীভাবে শেষ হবে, সে সম্পর্কে ধারণা পাওয়ার সময় এখনও আসেনি। একবার যুদ্ধ শুরু হয়ে গেলে তা নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে যুদ্ধে লিপ্ত পক্ষগুলো কীভাবে এর সমাপ্তি টানতে চায়, তার কিছু সম্ভাব্য উপায় খুঁজে দেখ যাক।
ট্রাম্পের কাছে বিজয়ের সংজ্ঞা
ফ্লোরিডার বাসভবন মার-এ-লাগো থেকে এক ভিডিও বার্তায় যুদ্ধ শুরুর ঘোষণা দেন মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প। এর পর থেকেই তিনি বরাবরের মতো মার্কিন শক্তির ব্যাপারে চরম আত্মবিশ্বাস দেখিয়ে আসছেন। অন্য কোনও প্রেসিডেন্ট হলে হয়তো ওভাল অফিসের রেজোলিউট ডেস্কের সামনে বসে গম্ভীর মুখে এ ধরনের ভাষণ দিতেন।
কিন্তু ট্রাম্প পরেছিলেন একটি ওপেন-নেক শার্ট ও মাথায় ছিল সাদা রঙের বেসবল ক্যাপ, যা তার চোখ পর্যন্ত ঢেকে রাখছিল। তিনি ইরানের বিরুদ্ধে দীর্ঘ অভিযোগের তালিকা তুলে ধরেন। তার দাবি, ইরান ১৯৭৯ সালের ইসলামি বিপ্লবের পর থেকেই যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি বড় ধরনের হুমকি হয়ে দাঁড়িয়েছে।
ট্রাম্প যেকোনও সময় তার মত বদলাতে পারেন। তবে ওই ভাষণে তিনি তার নিজের মতো করে বিজয়ের একটি সংজ্ঞা দাঁড় করিয়েছেন। এটি একটি তালিকার মতো:
‘আমরা তাদের সব ক্ষেপণাস্ত্র ধ্বংস করে দেব এবং তাদের ক্ষেপণাস্ত্র উৎপাদনশিল্পকে ধূলিসাৎ করে দেব। এটি আবারও পুরোপুরি ধ্বংস করে দেওয়া হবে।’
‘আমরা তাদের নৌবাহিনীকে ধ্বংস করে ফেলব।’
‘আমরা নিশ্চিত করব যেন এই অঞ্চলের সন্ত্রাসী প্রক্সি গোষ্ঠীগুলো আর কখনও মধ্যপ্রাচ্য বা বিশ্বকে অস্থিতিশীল করতে না পারে। তারা যেন আমাদের বাহিনীর ওপর হামলা চালাতে না পারে। তারা যেন আর আইইডি বা রাস্তার ধারের বোমা ব্যবহার করে অসংখ্য মার্কিন নাগরিকসহ হাজার হাজার মানুষকে হত্যা বা গুরুতর আহত করতে না পারে।’
ট্রাম্প দাবি করেন, ইরান এমন সব ক্ষেপণাস্ত্র তৈরি করছে, যা যুক্তরাষ্ট্রে আঘাত হানতে সক্ষম। যদিও এই দাবির পক্ষে যুক্তরাষ্ট্রের গোয়েন্দা মূল্যায়ন পাওয়া যায়নি।
মার্কিন প্রেসিডেন্ট এটাও দাবি করেন, ইরান পারমাণবিক বোমা তৈরির খুব কাছাকাছি পৌঁছে গেছে, যা গত গ্রীষ্মে দেওয়া তার নিজের বক্তব্যেরই বিরোধী। সেখানে তিনি বলেছিলেন যে, যুক্তরাষ্ট্র ইরানের পারমাণবিক স্থাপনাগুলো ‘গুঁড়িয়ে’ দিয়েছে।
ট্রাম্প বিশ্বাস করেন, ইসরায়েলকে সঙ্গে নিয়ে যুক্তরাষ্ট্র তেহরান সরকারকে পঙ্গু করে দিতে পারবে।
যদি ইরান আত্মসমর্পণ না-ও করে, তবু তারা এমনভাবে বিপর্যস্ত হবে যে, ইরানের জনগণের সামনে রাজপথে নেমে ক্ষমতা দখলের সবচেয়ে বড় সুযোগ তৈরি হবে। ইরানের কয়েক প্রজন্মের মধ্যে এমন সুযোগ আর আসেনি।
ডোনাল্ড ট্রাম্প বলেন, “আমাদের কাজ শেষ হলে, আপনারা আপনাদের সরকারের নিয়ন্ত্রণ নিজেদের হাতে তুলে নেবেন। এটা তখন আপনাদেরই হয়ে যাবে। প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে এটাই হয়তো আপনাদের একমাত্র সুযোগ। বছরের পর বছর ধরে আপনারা যুক্তরাষ্ট্রের সাহায্য চেয়েছেন, কিন্তু পাননি। আজ রাতে আমি যা করতে রাজি হয়েছি, অন্য কোনও প্রেসিডেন্ট তা করতে রাজি ছিলেন না। এখন আপনারা এমন একজন প্রেসিডেন্ট পেয়েছেন, যিনি আপনাদের কাঙ্ক্ষিত জিনিসটি দিচ্ছেন। তো চলুন দেখি আপনারা কীভাবে এতে সাড়া দেন।”
ইরানের জনগণকে সরাসরি উসকে দিলেও, শাসকগোষ্ঠী পরিবর্তনের দায়িত্বটা তাদের ঘাড়েই চাপিয়ে দিয়েছেন ট্রাম্প। এর মাধ্যমে, যদি (ইরানের) শাসকগোষ্ঠী টিকেও যায়, ট্রাম্পের জন্য এই দায় এড়ানোর একটি সম্ভাব্য পথ খোলা থাকবে।
তবে এটাকে পুরো প্রক্রিয়া শেষ করা যুক্তরাষ্ট্রের একটি নৈতিক দায়িত্ব হিসেবেও দেখা যেতে পারে। যদিও মার্কিন প্রেসিডেন্ট মনে করেন ‘সবকিছুতেই কোনও না কোনও চুক্তি করা সম্ভব’, তাকে এই নৈতিকতা কতটা প্রভাবিত করবে- সেটি একটি বড় প্রশ্ন।
শুধু আকাশপথে হামলা চালিয়ে কোনও সুসজ্জিত শত্রুর বিরুদ্ধে যুদ্ধে জয়ী হওয়া বা সরকার পরিবর্তনের কোনও নজির বিশ্বে নেই।
সাদ্দাম হোসেনকে ক্ষমতাচ্যুত করতে ২০০৩ সালে যুক্তরাষ্ট্র, যুক্তরাজ্য ও তাদের মিত্ররা ইরাকে বড় পরিসরে পদাতিক বাহিনী পাঠিয়েছিল।
২০১১ সালে লিবিয়ার কর্নেল মুয়াম্মার গাদ্দাফিকে ক্ষমতাচ্যুত করেছিল বিদ্রোহী বাহিনী। ন্যাটো ও উপসাগরীয় দেশগুলো তাদের অস্ত্র সরবরাহ করেছিল এবং আকাশপথে সুরক্ষা দিয়েছিল।
ট্রাম্প আশা করছেন, ইরানের জনগণ এই কাজটা নিজেরাই করতে পারবে।
মার্কিন প্রেসিডেন্টের এই পরিকল্পনা একটি বিশাল বাজি। শুধু বোমা মেরে সরকার পতন ঘটানোর এই কৌশলের সফল হওয়ার সম্ভাবনা একেবারেই কম।
দেশটিতে কি পশ্চিমা-পন্থী কোনও অভ্যন্তরীণ অভ্যুত্থান হতে পারে? অসম্ভব নয়, তবে যুদ্ধের এই পর্যায়ে এটিকে বেশ অস্বাভাবিক বলেই মনে হচ্ছে।
বরং এর চেয়ে এটাই বেশি সম্ভব যে বর্তমানে যারা সরকার পরিচালনা করছেন তারা আরও মরিয়া হয়ে উঠবেন এবং আরও বেশি ক্ষেপণাস্ত্র ছুড়বেন। তারা নিজেদের আদর্শে বলীয়ান হয়ে এই বিশ্বাস নিয়ে লড়বেন যে, যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল বা আরব দেশগুলোর চেয়ে তারা বেশি আঘাত সহ্য করতে সক্ষম।
তবে এই সংঘাতের সবচেয়ে বড় শিকার হবেন দীর্ঘকাল ধরে কষ্ট ভোগ করা সাধারণ ইরানি জনগণ। অথচ এ বিষয়ে তাদের কোনও মতামত দেওয়ার সুযোগ নেই।
