শারমিন সুলতানা॥
বাংলা সাহিত্যের আদি শিল্প কবিতা। পৃথিবী সৃষ্টিলগ্ন থেকেই মানুষের অনুভব, স্বপ্ন, বেদনা ও বিস্ময়ের সঙ্গে কবিতার এক নিবিড় সম্পর্ক গড়ে উঠেছে। সময়ের স্রোত বয়ে চলেছে, যুগ বদলেছে, মানুষের রুচি ও প্রকাশভঙ্গিও পরিবর্তিত হয়েছে; তবুও কবিতার প্রতি মানুষের আকর্ষণ আজও সামান্যও কমেনি।
তবে একটি সত্য স্বীকার করতেই হয়,সবাই কবিতা বোঝে না। অন্তত আমার বিশ্বাস তাই। যাদের মননে শৈল্পিক সত্তা জাগ্রত, তারাই মূলত কবিতাকে ভালোবাসে এবং কবিতার গভীরে প্রবেশ করতে পারে। শব্দের সাবলীল প্রয়োগে যে কবি পাঠকের মনে নান্দনিক এক অনুভূতির জন্ম দিতে পারেন, তিনিই প্রকৃত কবি।পিবি শেলীর ভাষায়-“poets are the unacknowledged legislators of the world”. অর্থাৎ কবিরাই পৃথিবীর অস্বীকৃত আইন প্রনেতা
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে কবিতার রূপ ও প্রকরণ বদলে গেছে। চর্যাপদের প্রাচীন ধারা পেরিয়ে ত্রিশের দশকের কবিতা, সেখান থেকে আধুনিক ও উত্তরাধুনিক কবিতার বহুবর্ণ পরিসর,প্রতিটি যুগেই পাঠকের প্রত্যাশা একটাই, আর তা হলো নান্দনিকতা। কবি তাঁর অনুভূতির সূক্ষ্ম সুতোগুলোকে কতটা নিপুণ বুননে কবিতার শরীরে গেঁথে দিতে পারেন,তার ওপরই নির্ভর করে বোদ্ধা পাঠকের গ্রহণক্ষমতা। যখন সেই বুনন সার্থক হয়, তখন কবিতার চরণ পাঠকের মুখে মুখে ফিরে বেড়ায়।
আজ আমি এমনই একটি কবিতাগ্রন্থ নিয়ে আলোচনা করতে চাই, যা আমার বিশ্বাস সময়ের মাহেন্দ্রক্ষণ পেরিয়ে আগামী কয়েক দশক ধরেও পাঠকের আলোচনায় ও অনুরাগে টিকে থাকবে। কবিতাগ্রন্থটির নাম ‘প্রতিবিম্ব কবিতা’। কবি শাহ মোহাম্মদ সানাউল হক। নান্দনিক এই গ্রন্থটি প্রকাশ করেছে জিনিয়াস পাবলিকেশন।
বাংলা কবিতার ধারায় এই গ্রন্থটি এক নতুন মাইলফলক সৃষ্টি করেছে বললে অত্যুক্তি হবে না। কারণ এখানে কবি প্রবর্তন করেছেন এক অভিনব কাব্যরীতি,একই শিরোনামে দুটি কবিতা, অর্থাৎ জোড়াবদ্ধ কবিতা। এই নির্মাণশৈলী কবিতাকে দিয়েছে এক স্বতন্ত্র মাত্রা।
প্রতিটি কবিতার শরীরে শিল্পীর সূক্ষ্ম কারুকাজ স্পষ্ট। খুব বেশি রঙের বাহুল্য নেই; বরং সংযত শব্দের নিপুণ তুলিতে কবি এঁকেছেন অসাধারণ সব চিত্রকল্প। তাঁর কবিতায় জীবনের গভীর বোধ প্রতিফলিত হয়েছে। আমাদের চারপাশের যাপিত জীবনের ক্ষুদ্র ক্ষুদ্র ঘটনাগুলোকেও তিনি এমনভাবে রূপ দিয়েছেন যে সেগুলো হয়ে উঠেছে কালোত্তীর্ণ কবিতার উপাদান। পাঠক একবার পাঠ না করলে এই শিল্পের গভীরতা উপলব্ধি করা কঠিন।
তবে দুঃখের বিষয়, এ ধরনের শিল্পচর্চা আমাদের দেশে রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতা খুব কমই পায়। পেলেও শিল্পীরা অনেক সময় জীবদ্দশায় তার স্বীকৃতি দেখে যেতে পারেন না।
তারপরও আশাব্যঞ্জক একটি দৃশ্য চোখে পড়েছে,বইমেলায় প্রথম দিনেই বইটি প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে দেখতে পেলাম পাঠকদের উচ্ছ্বসিত সাড়া। আমার বিশ্বাস, এই ভালোবাসাই কবির কলমকে আরও কয়েক ধাপ এগিয়ে নিয়ে যাবে।
নিচে এই গ্রন্থের কয়েকটি কবিতার চরণ নিয়ে সংক্ষিপ্ত আলোচনা করার চেষ্টা করছি, যাতে পাঠক কবির শিল্পকুশলতা কিছুটা হলেও অনুধাবন করতে পারেন। আমি কবিকে শিল্পী বলেই আখ্যায়িত করছি। কারণ, জীবনানন্দ দাশের ভাষায়,“সবাই কবি নয়, কেউ কেউ কবি।”
কবির ‘প্রলোভনের ধাতু (১)’ কবিতায় তিনি লিখেছেন “রাত্রির ফাঁক দিয়ে শরীরে ঢুকে পড়া প্রশ্নচিহ্নেরা বদলে যায়…”
কবিতার শুরুতেই প্রশ্নচিহ্নের বিস্ময়চিহ্নে রূপান্তর মানুষের জীবনের অনিশ্চয়তা ও আকস্মিক পরিবর্তনের ইঙ্গিত বহন করে। ‘প্রলোভনের ধাতু’ বিষয়টিও অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ। ধাতু যেমন শক্ত ও স্থায়ী, তেমনি প্রলোভনও মানুষের চেতনায় এক ধরনের স্থায়ী প্রভাব বিস্তার করে। এটি কেবল সামান্য তৃষ্ণা নয়; বরং তার চেয়েও গভীর এক মানসিক আকর্ষণ।
শরীরের ভেতর প্রতিধ্বনি গলে পড়া কিংবা শরীরের ভেতরে কেউ ‘ছিপ’ ফেলে রাখা,এই চিত্রকল্পগুলো মানুষের নিজের ওপর নিয়ন্ত্রণ হারানোর এক গভীর হাহাকার প্রকাশ করে।
একই শিরোনামের দ্বিতীয় অংশে কবি বলেন,
“আমার দেহে কোনো প্রশ্ন ছিল না,
কখনও আঁকিনি প্রশ্নচিহ্নের উলকি…”
এখানে কবি জানান, তাঁর ভেতরে প্রশ্নের জন্ম ছিল না; ছিল জন্মগত বিস্ময়। বিস্ময় মানুষের স্বাভাবিক ও নির্মল অনুভূতি, যা কৌতূহল জাগায়। কিন্তু ‘প্রতারক প্রশ্নচিহ্ন’ যেন বাইরে থেকে চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে,যা বড়শির মতো বিঁধে থাকে মানুষের অস্তিত্বে।
ক্বাতীসার ‘বেলেল্লা জিহ্বা’ এবং ‘নিঃসৃত ফোঁটা চেটেপুটে খাওয়া’,এই চিত্রকল্পগুলো তীব্র লালসা ও শোষণের প্রতীক। যেন মানুষের ভেতরের সেই নির্মল বিস্ময়কে ধ্বংস করে দেয় অন্ধ প্রলোভন।
‘মৎস্যশিকারির লালা’ এবং ‘শয়তান বড়শি’,এই ইঙ্গিত আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের পথে প্রলোভন কেবল আনন্দের প্রতিশ্রুতি দেয় না; বরং অনেক সময় তা হয়ে ওঠে আমাদের আটকে ফেলার ফাঁদ।
আরেকটি কবিতা ‘ডানা–২’-এ কবি লিখেছেন,
“মাটি খুঁড়ে বের করি নিজেকে,
নিজের দুহাত,যা গোপন ছিল ধূলার খেলাতে…”
এই চরণে আত্মঅন্বেষণের গভীর আকুতি প্রকাশ পেয়েছে। মানুষ যেন নিজের ভেতরেই খনন করে নিজের প্রকৃত সত্তাকে খুঁজে ফেরে। কিন্তু ট্র্যাজেডি হলো,যে হাত দিয়ে মানুষ নিজেকে খুঁজতে চায়, সেই হাতই প্রতিনিয়ত নিজের কবর খুঁড়ে চলে। এখানে জীবনের এক গভীর বৈপরীত্য ধরা পড়ে।
মানুষের সীমাবদ্ধতাকে কবি ‘পাখির ডানা নেই’,এই রূপকের মাধ্যমে তুলে ধরেছেন। যদি মানুষ সত্যিকার অর্থে ওড়ার মানে বুঝতে পারত, তবে হয়তো সে মাটির নিচের অন্ধকারে নয়, আকাশের অসীম বিস্তারে নিজেকে খুঁজত।
“যদি ওড়ার মানে বুঝতাম”,এই সংশয় মানুষের সেই অচেনা সম্ভাবনার কথাই মনে করিয়ে দেয়, যা আমরা অনেক সময় চিনতে পারি না বলেই ধ্বংসের অভ্যাসে ডুবে থাকি।
একই কবিতার আরেক স্থানে কবি বলেন,
“স্ক্র্যাপের অন্ধকারে খুঁজে দিই দুই হাত,
ভুলে যাওয়া সব সাদাকালো পাখি…”
এখানে ব্যস্ত জীবনের ক্লান্তি ও হতাশা কবিকে ফিরিয়ে নিয়ে যায় স্মৃতির গোপন অলিন্দে। পুরোনো স্মৃতি যেন মরচে ধরা ধাতুর মতো হয়ে যায়। আর ‘স্মৃতির ভেতর শুঁয়োপোকার গড়াগড়ি’,এই উপমা এক ধরনের অস্বস্তি ও রূপান্তরের ইঙ্গিত দেয়; যেন সেই স্মৃতিগুলো এখনো পূর্ণতা পায়নি, শুঁয়োপোকা এখনো প্রজাপতি হয়ে ওঠেনি।
এমন নান্দনিক চমক ও ভাবনার গভীরতায় ‘প্রতিবিম্বের কবিতা’ গ্রন্থটি পাঠকের কাছে অনন্য হয়ে উঠেছে। ধ্রুব এষ-এর চমৎকার প্রচ্ছদ বইটিকে দিয়েছে আরও একটি আকর্ষণীয় মাত্রা। এবারের বইমেলায় এটি নিঃসন্দেহে একটি উল্লেখযোগ্য কাব্যসংযোজন।
যারা এখনো বইটি সংগ্রহ করেননি, আশা করি অন্তত একটি কপি সংগ্রহ করবেন। কারণ এই গ্রন্থ পাঠককে দেবে এক ভিন্নমাত্রার কাব্যিক স্বাদ।
